প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের কাংপোকপি জেলায় বুধবার (১৩ মে, ২০২৬) এক ভয়াবহ সশস্ত্র হামলায় ৩ জন বিশিষ্ট চার্চ নেতা নিহত হয়েছেন। অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীদের এই অতর্কিত হামলায় আরও অন্তত ৫ জন আহত হয়েছেন, যা পুরো অঞ্চলে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
হতাহতরা চুরাচাঁদপুর জেলার লামকা এলাকায় টিবিএ সম্মেলনে যোগদান শেষে দুটি গাড়িতে করে কাংপোকপিতে ফিরছিলেন। পথে মাঝরাস্তায় ওত পেতে থাকা দুষ্কৃতীরা তাদের লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ করে।
নিহতরা হলেন: থাডৌ ব্যাপটিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (TBA) শীর্ষ নেতা ও মণিপুর ব্যাপটিস্ট কনভেনশনের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক রেভারেণ্ড ভি সিতলহাউ, রেভারেণ্ড ভি কাইগোলুন এবং যাজক পাওগোলেন।
আহতরা হলেন: রেভারেণ্ড এস এম হাওপু এবং রেভারেণ্ড হেকাই সিমতেসহ আরও তিনজন, যাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মণিপুরের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ২ নম্বর জাতীয় সড়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ জারি করা হয়েছে।
ধর্মঘটের ডাক: কুকি স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (KSO) বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। তবে জরুরি সেবা, সংবাদমাধ্যম এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে এর আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
শান্তি প্রচেষ্টায় আঘাত: কুকি ইনপি মণিপুর জানিয়েছে, নিহত রেভারেণ্ড ভি সিতলহাউ সম্প্রতি নাগাল্যান্ড জয়েন্ট ক্রিশ্চিয়ান ফোরামের সাথে শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। শান্তি আলোচনার সাথে যুক্ত একজন ধর্মীয় নেতার ওপর এই হামলাকে চলমান শান্তি প্রচেষ্টার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মণিপুরের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব ভারতের জাতিগত ও রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও ব্রিটিশ নীতি (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে মণিপুর ছিল একটি দেশীয় রাজ্য। ব্রিটিশরা তাদের 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' নীতির মাধ্যমে পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে যে বিভাজন তৈরি করেছিল, বর্তমান সংঘাতের শিকড় অনেকটা সেখানেই নিহিত। ১৯০০ সালের সেই প্রশাসনিক সীমানা ও জাতিগত বিন্যাস আজও আধুনিক মণিপুরের অস্থিরতার অন্যতম কারণ।
স্বাধীনতা ও সশস্ত্র আন্দোলন (১৯৭১-১৯৯০): ১৯৭১ সালের পর থেকে মণিপুরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের স্বাধিকার ও ভূমির অধিকার নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। নাগা, কুকি এবং মেইতেই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার স্বার্থের সংঘাত দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলকে রক্তাক্ত করেছে।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ও ২০২৬-এর বাস্তবতা: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশে যেমন ক্ষমতার পটপরিবর্তন এনেছে, তার প্রভাব প্রতিবেশী দেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও অনুভূত হচ্ছে। ২০২৬ সালের এই মে মাসে ধর্মীয় নেতাদের ওপর হামলা প্রমাণ করে যে, মণিপুরের শান্তি প্রক্রিয়া এখনো কতটা ভঙ্গুর।
২০২৬-এর প্রেক্ষিত: ১৯০০ সালের সেই দুর্গম পাহাড়ের মণিপুর থেকে ২০২৬ সালের আধুনিক মণিপুরে এখন তথ্যপ্রবাহ দ্রুত হলেও জাতিগত বিদ্বেষ কমেনি। ২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ মূলত এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অনিরাপত্তার বহিঃপ্রকাশ।
ইতিহাস সাক্ষী, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা একটি অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়াকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ১৯০০ সালের সেই ঔপনিবেশিক আমলের সংঘাত থেকে ২০২৬ সালের এই আধুনিক জাতিগত দাঙ্গা—মণিপুর বারবার রক্তঝরা ইতিহাসের সাক্ষী হচ্ছে। রেভারেণ্ড ভি সিতলহাউয়ের মতো শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রয়াণ ২০২৬ সালের মে মাসে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিল।
সূত্র: ১. মণিপুরের কাংপোকপি জেলায় সশস্ত্র হামলা ও চার্চ নেতা নিহত সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদন (১৩ মে, ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: উত্তর-পূর্ব ভারতের জাতিগত সংঘাত ও মণিপুরের রাজনৈতিক ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |